সিনেমা পর্যালোচনা: জ্যেষ্ঠপুত্র আসলে একটা কালোত্তীর্ণ ভাবনার অনবদ্য দৃশ্যায়ন

27,475 total views, 2 views today

আমি একটা কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, একজন পরিচালকের দৃশ্যকল্প পর্দায় দেখে কেউ তাকে বই বলবে না ছবি তা নির্ভর করে বেশ কিছু প্যারামিটার মানে নির্ণায়কের উপর। কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ একটা গড়পড়তা বাংলা বই নাকি এক অনবদ্য বাংলা ছবি সেকথাই আলোচনার।

কিছু বাংলা চলচ্চিত্রের, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে কিছু বাঙালি পরিচালকের সিনেমার একটা নিজস্ব চলন আছে। কৌশিক গাঙ্গুলীর সিনেমার যেমন একটা সরল ভাবে বলতে পারা জটিল মনস্তত্ত্ব রয়েছে। আমাদের রোজকার জীবনের এমন অনেক ঘটনা তিনি তুলে ধরতে পারেন সোজাভাবে। আমিত্বে ডুবে থাকা কোনও মানুষের সামনে হাসিমুখে একটা আয়না তুলে ধরতে পারেন কৌশিক দা। আক্ষরিক অর্থেই সমাজের আয়নায় সামাজিকতা আর দায়বদ্ধতার ছবি এঁকেছেন কৌশিক গাঙ্গুলী। আমার বিচারে কৌশিক গাঙ্গুলীর সেরা তিন সিনেমার মধ্যে অবশ্যই থাকবে ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’। আর হ্যাঁ! ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির সাথে যারা পরিচিত তারা বুঝতে পারবেন যে তাঁকে এর থেকে ভালো শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়া হয়তো সম্ভব হতনা। কৌশিক গাঙ্গুলীর কাছে এরকম ছবি আমরা আশা করেই থাকি। হতাশ করেননি কৌশিক।

যে গল্পের জন্মলগ্নই একটা গভীর আবেগঘন মুহুর্তে, সে ছবি যারা সত্যিই মানুষ তাদের ছোঁবে বা আবেগে ভাসাবে সে তো বলাই বাহুল্য। তবে এ ছবির চরিত্ররা চলচ্চিত্রের ঘেরাটোপ ডিঙিয়ে পাশের বাড়ির মানুষ হয়ে গেলেন; যে বাড়িতে দু’ভাইয়ের ঝগড়া হলে পাশের বাড়ির মা-কাকিমারা একটু আড়ি পেতে সুখ পাবেন। আবার ভাইদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেলেও বলবেন আহারে! কেমন যেন আত্মীয় হয়ে গেলেন ইন্দ্রজিৎ, পার্থ, ইলা, সুদেষ্ণারা।

জ্যেষ্ঠপুত্র কথাটার মধ্যেই কেমন যেন রাশভারী একটা ব্যাপার আছে। বড় মানেই তার কাঁধে অনেক দায়িত্বের বোঝা…ত্যাগের কাছে নতিস্বীকার! এখন বড় ছেলে যদি হন সুপারস্টার, তাহলে তার সাথে যোগ হয় খ্যাতির বিড়ম্বনা। আমরা সুপারস্টারদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যতটা উৎসুক ততটা সেন্সিটিভ ভাবে কী কখনও ভেবে দেখি রিল লাইফের বাইরে রিয়েল লাইফে তারাও আমাদের আর পাঁচ জনের মতো রক্ত মাংসেরই মানুষ?

ছবিতে অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে লেখা কিছু সংলাপ উস্কে দিয়ে যায় আরও অনেক অবধারিত প্রশ্ন। সুপারস্টার অভিনেতা ইন্দ্রজিৎকে এক প্রতিবেশী চাকরি, মাইনে নিয়ে বলেন, “তো সরকারি কিছু পেলি না?” আজ এই সময়ে দাঁড়িয়েও সত্যিই তো বাংলার চলচ্চিত্র জগৎ এই দোটানায় জর্জরিত। বাড়ির ছোটবউয়ের মুখে ননদের জন্য দুশ্চিন্তায় বেরোয় “মেজদির কি হবে?” ধাক্কা দিয়ে যায় আজকের নিউক্লিয়ার পরিবারতন্ত্রের গলায়।

এছবির প্রাণভোমরা হলো অভিনয়। কেউ কাউকে একচিলতে জমি ছাড়েন নি, বরং ছবির এক একটা অংশ নিজেদের নামে করে নিয়েছেন। শ্রেয়া নজর কাড়লেন সারল্যে। বেনি বোঝালেন কেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষ পছন্দ করতেন তার কাজ। গার্গী সুদেষ্ণাকে মিশিয়ে দিলেন মাটির গন্ধে। ঋত্বিক প্রতি ছবিতে তাক্ লাগিয়ে দেওয়াটা অভ্যাসে পরিণত করেছেন। সত্যিই যেন এক অদৃশ্য স্কেল আছে তার মধ্যে যা মেপে দেয় কোথায় কতটুকু অভিনয় প্রয়োজন। পার্থ থাকবে মনজুড়ে। প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি কি কি করতে পারেন সেই ধারণা বোধহয় এখনও আমরা পাইনি। এ বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে এ ছবি দেখলে। স্বয়ং পরিচালকের কথা ধার করেই বলি প্রসেনজিৎ-ঋত্বিক একসাথে পর্দায় থাকলে মনে হয় যেন একটা খাঁচায় দুটো নেকড়ে বাঘকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সহমত। তবে কৌশিক দা বলতে ভুলে গেছেন বা ইচ্ছে করেই বলেন নি যে তিনি এছবির পরতে পরতে এক জলজ্যান্ত বাঘিনী ছেড়ে রেখেছেন যে কোনো নেকড়েকেও রেয়াত করেননা; সুদীপ্তা চক্রবর্তী। ইলার বিচরণ এ ছবিতে একজন রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘিনীর মতোই। সবার অনবদ্য অভিনয় সত্ত্বেও এছবি হয়ে থাকবে সুদীপ্তার ছবি। আবার তিনি প্রমাণ করলেন যে, ভালো অভিনেতার জাত চেনাতে দীর্ঘ সময়ের পর্দার উপস্থিতি লাগেনা। কিছুদিন আগেই বুম্বা দা বলছিলেন, “বাংলা সিনেমা করতে গেলে একটা ক্যামেরা লাগে, একজন ডিরেক্টর লাগে আর একজন সুদীপ্তা চক্রবর্তী লাগে।” আমি সম্পূর্ণ সহমত বুম্বা দার সাথে। ছবিটা সবাই দেখলে আমি নিশ্চিত যে আমার দলে লোক বাড়বে।

সবাই অবশ্যই হলে গিয়ে দেখুন ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’। আত্ম-সমালোচনা করুন। মন দিয়ে দেখুন, ভালোবাসুন। এমন ছবি কিন্তু বাংলায় প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে আসেনা। আর হ্যাঁ! অবশ্যই এটা ভাবতে থাকুন কৌশিক গাঙ্গুলী বেশি বড় অভিনেতা না বেশি বড় পরিচালক!

রইল ছবির ট্রেলর:

1 thought on “সিনেমা পর্যালোচনা: জ্যেষ্ঠপুত্র আসলে একটা কালোত্তীর্ণ ভাবনার অনবদ্য দৃশ্যায়ন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Reach The Perspective